চেষ্টা করেও আটকে যায়? শেখার চারটি ভিন্নতা, সহজ বাংলায়
সন্তান চেষ্টা করেও পড়তে, লিখতে বা হিসাব করতে আটকে যায়? এটা অলসতা নাও হতে পারে। শেখার চারটি ভিন্নতা, ঘরে কী চোখে পড়তে পারে, আর কখন সাহায্য চাইবেন।

ধরুন, আপনার সন্তান সারাদিন পড়ছে। নামতা তিনবার লিখেছে, পাঁচবার মুখস্থ করেছে। পরদিন খাতায় দেখা গেল, সব ভুল। প্রথমেই মনে আসে: “ও ফাঁকি দিচ্ছে।” কিন্তু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অলসতা নয়। এই লেখায় আমরা চারটি ‘শেখার ভিন্নতা’ সহজ ভাষায় দেখব, আর জানব কখন সাহায্য চাইবেন।
অলসতা নয়, ভিন্নভাবে শেখা
কিছু শিশুর মস্তিষ্ক পড়া, লেখা, সংখ্যা বা শরীরের নড়াচড়াকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে প্রক্রিয়া করে। আমরা এটাকে বলছি ‘শেখার ভিন্নতা’। অনেকে একে ‘লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি’-ও বলেন।
এটা অলসতা নয়। বুদ্ধির অভাবও নয়। আপনার লালন-পালনের ভুলও নয়। শিশুর শেখার পথটা আলাদা, আর সেই পথে তার একটু অন্যরকম সাহায্য লাগে।
এই ভিন্নতা অনেক সময় বাড়িতে ধরা পড়ে না। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর, যখন পড়া আর লেখা প্রতিদিনের কাজ হয়ে ওঠে, তখনই সেটা বেশি চোখে পড়ে।
ডিসলেক্সিয়া: পড়া ও বানানে কষ্ট
ডিসলেক্সিয়ায় কষ্টটা মূলত পড়া আর বানানে। ঘরে যা চোখে পড়তে পারে: চেনা শব্দেও বারবার আটকে যাওয়া, অক্ষরের ক্রম গুলিয়ে ফেলা, জোরে পড়তে গিয়ে থেমে থেমে যাওয়া, অনেক বানান ভুল হওয়া।
মনে রাখুন, এটা বুদ্ধির সমস্যা নয়। বুঝতে পারার ক্ষমতা ঠিকই আছে। কঠিন হচ্ছে অক্ষর আর শব্দ চেনার জায়গাটা।
একবার একটা অক্ষর উল্টে ফেললেই ধরে নেবেন না। ছোট শিশুদের অক্ষর গুলিয়ে ফেলা অনেক সময়ই হয়। লক্ষণটা হলো চেনা শব্দেও একই সমস্যা বারবার, দীর্ঘ সময় ধরে।
"এটা অলসতা নয়, বুদ্ধির অভাবও নয়। কিছু শিশুর শেখার পথটাই ভিন্ন।"
ডিসক্যালকুলিয়া: সংখ্যা ও হিসাবে কষ্ট
ডিসক্যালকুলিয়ায় কষ্টটা সংখ্যা আর হিসাবে। শিশু বারবার শিখেও নামতা বা সহজ যোগ-বিয়োগ ভুলে যেতে পারে। অঙ্কের গল্পের সমস্যায় আটকে যেতে পারে, হিসাবের খেলা এড়িয়ে চলতে পারে।
ছোটবেলায় আঙুলে গুনে হিসাব করা স্বাভাবিক। তাই আঙুল গোনা দেখেই চিন্তা করবেন না। লক্ষণটা হলো বারবার অনুশীলন করার পরও আটকে যাওয়া। এটাও বুদ্ধির অভাব নয়, আর সাধারণত ছয় বছর বয়সের কাছাকাছি স্কুলের পড়ায় বেশি চোখে পড়ে।
ডিসগ্রাফিয়া: হাতে লেখায় কষ্ট
ডিসগ্রাফিয়ায় ভাবনাকে লেখায় নামাতে কষ্ট হয়। লিখতে অনেক সময় লাগে, লাইন বেঁকে যায়, অক্ষরের মাপ আর ফাঁক সমান থাকে না, কলম ধরতেও কষ্ট হতে পারে।
অনেক সময় এই শিশুকে “অগোছালো” বা “ফাঁকিবাজ” বলা হয়। অথচ ভাবনাটা তার মাথায় ঠিকই আছে; কাগজে নামাতেই কষ্ট। কিছু শিশু পরিষ্কার লেখে, কিন্তু সেজন্য অনেক বেশি পরিশ্রম করে।
ডিসপ্র্যাক্সিয়া: শরীরের সমন্বয়ে কষ্ট
ডিসপ্র্যাক্সিয়া, যাকে ডেভেলপমেন্টাল কোঅর্ডিনেশন ডিসঅর্ডারও বলা হয়, শরীরের সমন্বয়কে প্রভাবিত করে। জুতোর ফিতা বাঁধা, জামার বোতাম লাগানো, কাঁচি ধরা, বল ছোড়া বা ধরার মতো কাজে কষ্ট হতে পারে।
একটা সতর্কতা: শুধু দুরন্ত বা অসাবধান হলেই এটা নয়। একই কাজে বারবার, বয়সের তুলনায় অনেক বেশি কষ্ট হলে বিশেষজ্ঞকে দেখানো ভালো। সাধারণত পাঁচ বছর বয়সের পর বিশেষজ্ঞ এটি নিশ্চিত করেন।
সন্তানকে কোন কথাগুলো বলবেন, কোনগুলো নয়
এই শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় আমাদের কথায়। “তুই অলস”, “মন দিলেই পারিস”, “ওর বয়সে তো অমুক পারত” — এই কথাগুলো এড়িয়ে চলা যায়। চেষ্টা করেও আটকে যাওয়া শিশুকে অলস বললে সে শিখতে পারে “আমি খারাপ”, আর চেষ্টা করাই ছেড়ে দিতে পারে।
বদলে বলুন: “কোন জায়গাটা কঠিন লাগছে, আমাকে দেখাও।” “চলো একসঙ্গে করি।” “তুমি চেষ্টা করছ, আমি দেখতে পাচ্ছি।”
শিশুকে বোঝান: কাজটা কঠিন, সে খারাপ নয়।
কখন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন
এই লক্ষণগুলো যদি একবার-দুবার নয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বারবার দেখা যায়, আর শিশু পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে বা পড়তে-লিখতে বসতেই ভয় পাচ্ছে, তখন অপেক্ষা না করে একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন।
শিশুর শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলাও একটি ভালো প্রথম ধাপ। ক্লাসে সে কেমন করছে, কোন জায়গায় আটকাচ্ছে, তা তাঁরা দেখতে পান।
মনে রাখবেন, ডায়াগনোসিস শুধু যোগ্য বিশেষজ্ঞ করেন। এই লেখা কোনো ডায়াগনোসিস নয়, আর বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের বিকল্পও নয়।
অ্যাঞ্জেল ফাউন্ডেশন কীভাবে পাশে আছে
অ্যাঞ্জেল ফাউন্ডেশনে আছে মূল্যায়ন ও স্ক্রিনিং, বিশেষ শিক্ষা, অকুপেশনাল থেরাপি এবং অভিভাবকদের জন্য কাউন্সেলিং।
কথা বলতে চাইলে ফোন করুন ০১৭১৭ ২৩৭৯৬৩ নম্বরে, অথবা ফেসবুক পেজে ইনবক্স করুন। ঠিকানা: ৪৫৭ ইব্রাহিমপুর, কাফরুল, ঢাকা। চাইলে এই ওয়েবসাইটের ‘বুক কনসাল্টেশন’ পাতা থেকেও অনুরোধ পাঠাতে পারেন।
তথ্যসূত্র
এই লেখার তথ্য নেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা NHS (dyslexia, developmental coordination disorder), ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক (dyscalculia, dysgraphia), Understood.org এবং ইন্টারন্যাশনাল ডিসলেক্সিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ নির্দেশনা থেকে।
এটি ডায়াগনোসিস নয়। এমন কিছু চোখে পড়লে অপেক্ষা না করে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। ‘অভিভাবকের পাঠশালা’ সিরিজের পরিচিতি ও সব পর্বের তালিকা দেখতে ‘অভিভাবকের পাঠশালা’ লেখাটি পড়ুন।
Our team of specialists and educators share insights to help families navigate the journey of raising children with special needs.
Have questions about your child's development?
Our specialists are ready to listen. Book a free consultation today.
Book a Consultation
